***** নিম্ন মধ্যবিত্ত টিউশন মাস্টার *****
এখন আর নেই সেই চিরকালীন ব্যাস্ততা, নেই সব সময় বাজতে থাকা স্যার নামক অমৃতবানীটা, নেই কাকভোরে উঠে দিনের প্রথম ক্লাস শুরু করার ব্যাস্ততা । আছে শুধু একরাশ চিন্তা- হতাশা আর নিজের প্রীতি তীব্র ঘৃণা ! এখন আর বাড়ি থেকে বেড়ানোর জন্য সন্তানের সাথে লুকোচুরি খেলতে হয় না । কারন ছেলে টাও জেনে গেছে করোনা বলে কেউ এসেছে যে আমার বাবাকে বাড়ির বাইরে যেতে মানা করেছে । এই নিয়ে সে আবার গান ও বেঁধেছে
“ করোনা করোনা করোনা – ইচ্ছা হলেও বাইরে যেও না ”
এখন আর শুনতে হয় না ক্লাসে একে- অপরের প্রতি অভিযোগ। শুনতে পায় না ক্লাস ফাইভের অঙ্কের ক্লাসে সেই মিষ্টি মেয়েটার এক কলি গান , খুব মিস করি দশম শ্রেনীর হঠাৎ বড় হওয়া ছেলে মেয়ে গুলো ঝগড়া – কারা ভালো ছেলেরা না মেয়েরা।
কাজের ব্যস্ততায় ভুলে যাওয়া না খাওয়া টিফিনটা বাড়ি ফেরার আগে পথের কোন কুকুরকে যত্ন করে খাইয়ে দেওয়া । ওরা বুঝি আর এখন পথ চেয়ে বসে থাকে না , হয়তো জেনে গেছে সে আর আসবে না। ক্লান্ত নিস্তেজ শরীর নিয়ে যখন বাড়ি ফেরা তখন ছেলে বাবার জন্য কাঁদতে কাঁদতে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আমারও আবার ব্যাস্ততা কাল যে আবার নতুন করে শুরু করার পালা ।
হঠাৎ করে কালো মেঘ জীবনের সব চেনা ছন্দগুলিকে ওলটপালট করে দিল এক অদৃশ্য শত্রু !
একটা সময়ের বিরামহীন ব্যাস্ততা আমাকে আষ্টে-পৃষ্টে জরিয়ে ধরেছিল আজতার লেশ মাত্র নেই । কাকভোর তো দুরের কথা এখন ঘুম ভাঙ্গে ছেলেটার জড়াজড়িতে টাও সকাল ৮-৯ তার আগে নয় । এমনটা নয় অলসতা গ্রাস করেছে আসলে ফেলে আশা রাত গুলো যে বড়ই ভয়ঙ্কর!প্রহর যত বাড়ে দুশ্চিন্তার জালগুলো আর শক্ত করে জরিয়ে ধরে আগামীর সকাল গুলো চিন্তায় । যা ছিল সঞ্চয়ে সবই তো শেষের পথে এবার চলবে কি করে ? আমরা তো নিম্ন মধ্যবিত্ত টিউশন মাস্টার, এটাই আমাদের জীবন পালনের একমাত্র বাহন । আমাদের হয়তো এই সমাজে খুব একটা মান নেই কিন্তু সত্যি বলতে আমাদের আত্মসম্মানের শেষ নেই ।
হাজার কষ্ট মুখ বুজে আমারা সইতে পাড়ি কিন্তু পারবো না রাস্তায় দাঁড়িয়ে ত্রান নিতে, পারবো অনুদানের জন্য নেতাদের তেল দিতে, পারবো না অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে হাতপেতে কিছু চাইতে । আমারা যে নিম্ন মধ্যবিত্ত টিউশন মাস্টার ।
তাই সবাই পারলেও আমরা পারিনা রাস্তার ধারে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পাছে কোন অভিভাবক দেখে ফেলে – এ বাবা মাস্টার কি আড্ডা দেবে রাস্তার ধারে! পারিনা নিজের পছন্দের পোশাক পোরতে এই না কেউ বলে ফেলে ইস মাস্টারের ড্রেস দেখ ? এই রকম আর কত শত।
দিনের পর দিন বেতন থেকে বঞ্চিত তবুও চাওয়ার অধিকার আমাদের নেই , এ কি মাস্টার শুধু টাকা টাকা বলে । জীবনের কোন ক্ষেত্রেই আমারা সফল নয় একমাত্র কাজের জায়গা ছাড়া । না পারি বাবা মায়ের খুশি মতো টাকা তাদের হাতে তিলে দিতে , না পারি সহ ধর্মিণীর আশা পুরন করতে, আশা তো ছাড়ুন সময় টুকুও দিতে পারি না। নিজের সন্তানের সব খুশি পুরন করতে না পারলেও আমাদের অন্যর সন্তানের কোথায় সারাদিন ভাবতে হয় ।
আবার অনেকে বলেই ফেলে মুখের উপরে যারা কিছু করতে পারে না তারায় টিউশন করে ।
লকডাউন যত বাড়ছে আমাদের জীবন ততই গ্যাসহীন বেলুনের মতো চুপসে যাছে। কি করে চলবে বাকি দিন গুলো ।
কেউ খোঁজ রাখে না , সরকার তো একদমই নয় । সরকার আর রাজনৈতিক দল গুলো জানে কোথায় ভোট , সে তো পরিযায়ী শ্রমিকের কাছে । আচ্ছা আমরা কি এই মুহূর্তে পরিযায়ী শ্রমিকের থেকে ভালো আছি? না বরং আরও খারাপ – কারন আমরা যে নিম্ন মধ্যবিত্ত বুক ফাটলেও আমাদের মুখ ফাটে না । আবার যদি পড়ানো শুরু হয় । পড়াবো আমাদের বেতন দেবার সময় শুনতেও হবে মাস্টার 2 মাস তো পড়ান নি। তাই ওই দু মাসের টাকাও দিচ্ছি না। আর হ্যাঁ একটু এক্সট্রা ক্লাস করে সিলেবাস টা শেষ করে দেবেন।
চিন্তা নেই সিলেবাস তো শেষ করবোই আর এমনিতেও আমরা ওই দুমাসের বেতন চাইতাম না। আমরা যে নিম্ন মধ্যবিত্ত টিউশন মাস্টার।
শুনেছিলাম আমাদের বিভিন্ন প্রাইফেট শিক্ষক সংগঠন গুলি সরকার কে সাহায্য চেয়ে চিটি দিয়েছিল জানি তা দেখার সময় সরকারের নেই । কারন এখানে ভোটের নেশারু গন্ধ নেই ।
আমার হয়তো এইভাবেই একটু একটু করে হারিয়ে যাবো । তবু মুখ খুলবো না , হাত পাতবো না । আমরা যে নিম্ন মধ্যবিত্ত টিউশন মাস্টার।
Rabisankar Tung